Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২২ মে, ২০২২ , ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

গড় রেটিং: 2.7/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-০৩-২০২০

চাকরি দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেন মিঠুন

চাকরি দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেন মিঠুন

বরিশাল, ৩ অক্টোবর- পরিপাটি পোশাক-পরিচ্ছদ। হাতে দামি ঘড়ি। ব্যবহার করেন দামি স্মার্টফোন। প্রাইভেটকারে চলাফেরা। কখনও তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব, কখনও মন্ত্রীর পিএস, কখনও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, আবার কখনও মারা যাওয়া নারী সংসদ সদস্যের স্বামী। এসব পরিচয়ে দীর্ঘদিন প্রতারণা করে আসছেন তিনি।

বেশভূষা দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি আসল না নকল। কথা বলেন গুছিয়ে। কথায় কথায় জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রসঙ্গ টানেন। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের লোগো ব্যবহার করে ভিজিটিং কার্ড ছেপেছেন। দুইজন সহযোগী তার সঙ্গে থাকেন। এসব কারণে সহজেই মানুষ তাকে বিশ্বাস করেন। একপর্যায়ে তিনি চাকরি পাইয়ে দেয়ার কথা বলেন। পরে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। এভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

চাকরি দেয়ার কথা বলে প্রতারণার ঘটনায় সম্প্রতি বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। ওই জিডির সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে তার প্রতারণার ১০টি ঘটনা। এই জিডি করেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর একান্ত সচিব (পিএস) খায়রুল বাশার।

জিডিতে খায়রুল বাশার উল্লেখ করেন, মৌলভীবাজারের কমলনগর উপজেলার শেফালী কৈরী নামে এক নারী ফোন করে আমাকে বলেন আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের আস্কর কালীবাড়ি গ্রামের মৃত যোগেশ বিশ্বাসের ছেলে মিঠুন কুমার বিশ্বাস নিজেকে পিএস পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর চাকরি দেয়ার কথা বলে শেফালী কৈরী এবং তার খালাতো ভাই বিপ্র দাসের কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা নেন।

মিঠুন কুমার বিশ্বাস নামে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বর্তমানে বা অতীতে কোনো পিএস কিংবা এপিএস ছিল না। তাই যে ব্যক্তি পিএস বা এপিএস পরিচয় দিয়েছেন তাকে শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। এরপর পিএস খায়রুল বাশার প্রতারণার শিকার নারীকে ফোন দিয়ে প্রতারকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলেন।

শেফালী কৈরী জানান, তার খালাতো ভাই মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বিলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা বিপ্র দাসের সঙ্গে গত বছর ঢাকায় মিঠুন কুমার বিশ্বাসের দেখা হয়। এ সময় মিঠুন কুমার বিশ্বাস নিজেকে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর একান্ত সচিব (পিএস) পরিচয় দেন। বিপ্র দাস সিলেট ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত। তার চাকরি স্থায়ী করে দেয়ার কথা বলে তিন লাখ ৩৩ হাজার টাকা নেন মিঠুন কুমার।

শেফালী কৈরী বলেন, বিপ্র দাসের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে আমার সঙ্গে দেখা করেন মিঠুন কুমার। পরে সমাজসেবা অধিদফতরে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির প্রলোভন দেখান। ঢাকায় গিয়ে দেখা করতে বলেন। তার কথামতো গত বছর নভেম্বর মাসে ঢাকা গিয়ে মিঠুন কুমার বিশ্বাসকে ফোন দেই। সঙ্গে খালাতো ভাই বিপ্র দাসও ছিল।

তিনি দামি একটি গাড়ি পাঠিয়ে দেন। চালক আমাদের বিলাসবহুল একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন মিঠুন কুমার। আমাদের আপ্যায়ন করা হয়।

তখন মিঠুন কুমার বলেছিলেন একান্ত সচিব (পিএস) হিসেব ২৬ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। দু-একজনকে চাকরি দেয়া তার কাছে ব্যাপার নয়। এরপর তার হাতে নয় লাখ ৭৬ হাজার টাকা তুলে দেই আমরা।

এরপর ১০ মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কিছুই হয়নি। ফোন করলে মিঠুন কুমার বলেন আরও টাকা লাগবে। এভাবে ঘুরাতে থাকলে সন্দেহ হয়। এরপর পিএস খায়রুল বাশারকে খুঁজে বের করি। বিষয়টি তাকে জানানো হয়। আগৈলঝাড়ার বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় মিঠুন কুমারের ঠিকানা জানতে পারি।

শেফালী কৈরী বলেন, চাকরি, পদোন্নতি, বদলি বিভিন্ন কথা বলে রাজনগর উপজেলার বিলবাড়ি গ্রামের অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন মিঠুন বিশ্বাস।

এদিকে বিষয়টি জানাজানি হলে মিঠুন বিশ্বাস সম্পর্কে অনেকে ফোন করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ জানান।

অভিযোগ থেকে জানা গেছে, চাকরির কথা বলে সুনাগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাতুয়া গ্রামের দিলীপ কৈরীর স্ত্রী রেবার কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে নয় লাখ ৮৯ হাজার টাকা, ময়মনসিংহের ঋতিকার কাছ থেকে ১০ হাজার এবং ঋতিকার বোন শামসুন নাহারের মেয়েকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা বলে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন মিঠুন কুমার।

ঋতিকা জানান, মিঠুন কুমার নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দেন এবং তার ভিজিটিং কার্ডও দেন।

বাগেরহাটের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির জানান, বরিশালের এক লোকের মাধ্যমে মিঠুন বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর একদিন মিঠুন বিশ্বাস আমার কাছে গিয়ে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে টাকা ধার চান। তিনি বলেন, মংলায় তার একটি ঠিকাদারি কাজ চলছে। শ্রমিকদের টাকা দিতে হবে। ওই ধারের টাকা ক’দিন পরে ফেরতও দেন মিঠুন। এর কিছুদিন পর মোটা অংকের টাকা ধার নিয়ে তা আর ফেরত দেননি মিঠুন কুমার। এখন কল দিলে ফোন ধরেন না তিনি।

মিঠুন কুমার বরিশাল সিটি করপোরেশনের অফিস সহায়ক ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে চাকরি পাইয়ে দেয়ার কথা বলে উজিরপুর উপজেলার পরিতোষ বেপারীর কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা, একই গ্রামের বিমল মণ্ডলের ছেলে তন্ময় মণ্ডলের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা নিয়েছেন।

একইভাবে ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি দেয়ার কথা বলে বরিশাল বিমানবন্দর থানা এলাকার সোলনা গ্রামের গণেশ চন্দ্র দাসের কাছ থেকে ২০ হাজার, গণেশের মামাতো ভাই একই থানার তিলক গ্রামের তন্ময় দাসের কাছ থেকে তিন লাখ ৭৪ হাজার টাকা নেন মিঠুন কুমার। টাকা ফেরত না পেয়ে গণেশ চন্দ্র দাস তার ও তন্ময় দাস বাদী মিঠুন কুমারকে আসামি করে আদালতে দুটি মামলা করেন।

পরিতোষ বেপারী ও গণেশ চন্দ্র অভিযোগ করেন, টাকা নেয়ার পর মৌখিক পরীক্ষার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও জন্মনিবন্ধনের মূল সনদপত্র নেন মিঠুন। এরপর টাকা ফেরত চাইলে সনদ আটকে রেখে হয়রানি করা হয়। মিঠুন কুমারের নেতৃত্বে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ একটি চক্র কাজ করছে। এই চক্রের সদস্য মিঠুনের বোনের ছেলে বিপুল বৈদ্য, কমল বিশ্বাস ও গোলক হালদারসহ কয়েকজন বরিশালে কাজ করেন। কেউ টাকা ফেরত চাইলে চক্রের সদস্যদের দিয়ে হুমকি দেয়া হয়।

পরিতোষ বেপারী ও গণেশ চন্দ্র আরও বলেন, আমাদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার সময় মিঠুন কুমার নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা বলেছিলেন। ভিজিটিং কার্ড দিয়েছিলেন। কার্ডেও আওয়ামী লীগ নেতা লেখা রয়েছে। একাধিক সিম কার্ড ব্যবহার করেন। তার গাড়িতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের সিল ও প্যাড থাকে।

মিঠুন কুমারের গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের আস্কর কালীবাড়ি এলাকায়। ওই গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে মিঠুন সবার ছোট।

একই এলাকার সুভাষ বৈদ্যর মেয়ে বেবী বৈদ্যকে বিয়ে করে বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন। মিঠুন এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। গ্রামে খুব একটা আসেন না। গ্রামের সবাই জানেন মিঠুন কুমার ঢাকায় ব্যবসা করেন। কিন্তু মিঠুনের বিরুদ্ধে এলাকায় নানা অভিযোগ।

প্রতারণার মাধ্যমে একাধিক বিয়ে, টাকা হাতিয়ে নেয়াসহ নানা অপকর্মের কারণে গ্রামের অনেকে মিঠুনকে এড়িয়ে চলেন। তার অপকর্মের কারণে এলাকায় ‘ফটকা মিঠুন’ নামে বেশি পরিচিত।

আগৈলঝাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ মো. লিটন বলেন, মিঠুন কুমার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সদস্য নন। তিনি প্রতারণা করতে এসব দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করছেন। তার বিরুদ্ধে এলাকায় বিস্তর অভিযোগ।

তিনি আরও বলেন, লেনদেনের আগে অবশ্যই তার সম্পর্কে খোঁজ নেয়া উচিত ছিল সবার। তার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে লেনদেন করলে এতগুলো ঘটনা ঘটতো না।

আরও পড়ুন:  সিলেটের এমসি ক্যাম্পাসে ব্ল্যাকমেইল, ধর্ষণের ফাঁদ

অগৈলঝাড়া থানা পুলিশের ওসি মো. আফজাল হোসেন বলেন, মিঠুন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে থানায় জিডি রয়েছে। জিডির অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মিঠুন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকজন মৌখিক অভিযোগ করেছেন। তাদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে মিঠুন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমি একজন ব্যবসায়ী। আমার আমদানি-রফতানির লাইসেন্স রয়েছে। গ্রামেও অনেক জমি-জমা রয়েছে। আমার অর্থ-বিত্ত দেখে কিছু মানুষ হিংসা করছে। তারা আমার সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছে। যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।’

তিনি বলেন, ব্যবসা করতে গেলে বিভিন্ন সময় নগদ টাকার প্রয়োজন হয়। দু-একজন হয়তো আমার কাছে টাকা পাবেন। টাকা দিতে দেরি করায় এক পাওনাদার মামলা করেছেন। তার টাকা ফেরত দেয়ার চেষ্টা করছি।

সূত্র: জাগোনিউজ

আর/০৮:১৪/০৩ অক্টোবর

অপরাধ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে