Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ৮ আগস্ট, ২০২২ , ২৪ শ্রাবণ ১৪২৯

গড় রেটিং: 2.8/5 (40 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-১৮-২০২০

স্বাস্থ্য খাতকে যেভাবে ঢেলে সাজানো যায়

ডা. এম এ আজিজ


স্বাস্থ্য খাতকে যেভাবে ঢেলে সাজানো যায়

কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবে আজ বদলে যাচ্ছে পৃথিবী, মানুষের জীবনযাপন, রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, এমনকি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আজ সময় এসেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবার, কথা বলার।

করোনা মহামারীতে সব দেশই তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত রূপ দেখতে পেয়েছে। যারা নিজেদের শক্তিশালী মনে করত, তারাও আজ অসহায়। আর তাই সবার নজর এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর দিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ঢেলে সাজিয়েছিলেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। চিকিৎসকদের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ও ইন-সার্ভিস ট্রেনিং প্রথা চালুর মাধ্যমে চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন সাবসেন্টার, নিপসম, বিএমআরসি, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজসহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আরও অনেক কিছু।

পরবর্তী সময়ে আমরা চিকিৎসক সমাজ একুশ বছর ২১ দফা, ২৩ দফা নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ডা. মিলন শহীদ হওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার চিকিৎসকসহ সব পেশাজীবীর দাবিদাওয়া পূরণ করবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর আমাদের আরও অনেক উন্নয়ন লক্ষ করেছি।

জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, কমিউনিটি ক্লিনিক, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতালসহ অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ২০০১ সালের পর কমিউনিটি বন্ধ করে দেয়া হয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অর্জনগুলো পিছিয়ে পড়ে। আবার ২০০৯ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর স্বাস্থ্য সেক্টর আবারও উন্নয়নের গতি ফিরে পেল।

প্রতিষ্ঠা হতে লাগল আরও বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, আবারও চালু হল কমিউনিটি ক্লিনিক। আন্তর্জাতিক অনেক সূচকেও এগিয়ে গেল স্বাস্থ্য খাত। ফলে Millenium Development Goal অর্জনে সাউথ-সাউথসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত হন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

গত এক যুগে স্বাস্থ্য খাতে যে উন্নয়ন হয়েছে তার ফলেই কোভিড-১৯ মহামারীতেও মোকাবেলা করে যাচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। স্বল্প সময়েও অনেক উন্নত দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেখানে ভেঙে পড়েছে, সেখানে আমরা পাঁচ মাস ধরে আমাদের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে কোভিড-১৯ মোকাবেলা করে যাচ্ছি। এর মধ্যেও অনেক আলোচনা, সমালোচনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্নীতির জন্ম হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। জনগণের প্রত্যাশাও আকাশচুম্বী, আর এখনই সময় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর।

আমাদের দেশের প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেই গুটিবসন্ত, কলেরা/ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জনগণের আরও দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে ইউনিয়ন সাবসেন্টারের মাধ্যমে।

প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবায় জননেত্রী শেখ হাসিনার কমিউনিটি ক্লিনিক আজ সারা বিশ্বে নন্দিত ও প্রশংসনীয়। আমাদের দেশে এখন শহরাঞ্চলে প্রাইমারি হেলথ কেয়ারকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। আজকের বাস্তবতায় এমন এক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দরকার, যা মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে। সেজন্য-

* কমিউনিটি ক্লিনিককে আরও শক্তিশালী করতে কমিউনিটি ক্লিনিকে Maternal and Child Health Service দ্রুত বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

* উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পদমর্যাদা উন্নীত করা যেতে পারে।

* উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার (ইএমও), মেডিকেল অফিসার এবং ডেন্টাল সার্জনের পদ সৃষ্টি করে বহির্বিভাগ সেবাকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।

* উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা Maternal and Child Health Service চালু করা যেতে পারে।

* জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জনের পদমর্যাদা উন্নীত করতে হবে, সেই সঙ্গে কমপক্ষে ৩টি অতিরিক্ত সিভিল সার্জনের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে (অতিরিক্ত সিভিল সার্জন প্রাইমারি হেলথ কেয়ার, অতিরিক্ত সিভিল সার্জন প্রশাসন, অতিরিক্ত সিভিল সার্জন স্বাস্থ্যসেবা)।

* জেলা সদর হাসপাতালগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে জেলার স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে এবং নতুন পদ সৃষ্টি করে জনবল বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

* জেলা সদর হাসপাতালগুলোয় ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার (ইএমও), মেডিকেল অফিসার, ডেন্টাল সার্জনসহ জনসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব বিভাগে স্পেশালিস্ট পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

* জেলা সদর হাসপাতালগুলোয় স্বয়ংসম্পূর্ণ আইসিইউ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটারের সঙ্গে সিটি-এমআরআইসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে।।

* টারশিয়ারি এবং স্পেশালাইজড হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে এবং আমাদের মতো জনবহুল একটি দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে নতুন পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

* স্বাস্থ্যসেবাকে যুগোপযোগী, সুশৃঙ্খল ও কার্যকরী সেবা প্রদানের লক্ষ্যে উন্নত দেশের মতো রেফারেল সিস্টেম চালু করা যেতে পারে।

* বিভাগীয় পরিচালকের পদমর্যাদা উন্নীত করতে হবে এবং উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

* মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক ও অধ্যাপকের পদমর্যাদা উন্নীত করা যেতে পারে।

* দেশে স্বাস্থ্য সেক্টরের কাজকে গতিশীল করতে একটি Health Trainings Institute স্থাপন জরুরি, যা অতি দ্রুত করা যেতে পারে।

* মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈষম্য দূর করা যেতে পারে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সব অধিদফতরকে একই ভবনে এনে স্বাস্থ্য খাতে প্রশাসনিক ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ প্রবর্তন করা গেলে তা হবে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

* বিসিএসে বিদ্যমান ১টি ক্যাডারকে নিুলিখিত চারটি স্তরে সাজাতে হবে, যেমন- ১. বিসিএস স্বাস্থ্য প্রশাসন, ২. বিসিএস স্বাস্থ্য শিক্ষা, ৩. বিসিএস স্বাস্থ্যসেবা, ৪. বিসিএস স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা। সব ক্যাডারের ডিজিকে গ্রেড-১ পদমর্যাদা দেয়া যেতে পারে।

* বিসিএস লিখিত পরীক্ষাকে যুগোপযোগী করতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বতন্ত্র সিলেবাস প্রণয়ন করা যেতে পারে।

* আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে এবং অপচয় রোধ করে দ্রুত, সঠিক ও প্রয়োজনমাফিক কেনাকাটার জন্য সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা যেতে পারে।

* চিকিৎসাসেবা জনগণের জন্য সহজলভ্য ও নিশ্চিত করতে দেশে ক্রমান্বয়ে হেলথ ইন্সুরেন্স চালু করা যেতে পারে।

* পরিবার পরিকল্পনা সব দেশেই Maternal and Child Health (MCH) ভিত্তিক সেবা এবং এ সেবায় চিকিৎসকের বিকল্প চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই। কাজেই চিকিৎসকদের প্রাধান্য দিয়ে পরিবার-পরিকল্পনা অধিদফতরকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং মন্ত্রণালয়কে সেভাবে বিন্যস্ত করা যেতে পারে।

* বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

* জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে। বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক একটি অধিদফতর প্রয়োজন।

* দেশে একটি ডেন্টাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যেতে পারে।

* স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ডেন্টাল সার্জনের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

* হাসপাতালগুলোর ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকরী করতে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিএসসি-ফার্মাসিস্টের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

* দেশের ওষুধ শিল্প ও বিভিন্ন ফার্মোসর কথা চিন্তা করে ওষুধ প্রশাসনে নতুন পদ সৃষ্টি করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

* নার্সিং অধিদফতরে পেশাদারি নার্সিং কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করে নার্সিং অধিদফতরকে ঢেলে সাজাতে হবে।

* হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদিকে আরও যুগোপযোগী করতে হবে। ইতোমধ্যে উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে পদায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

* স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরকে ঢেলে সাজিয়ে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

* স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কাজ করানো হয়। তাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আর্থিক ব্যয় অধিক হয় এবং সময়ও অধিক লাগে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো জবাবদিহিতা থাকে না। কাজেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরকেই করতে হবে।

* স্বাস্থ্য খাতে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বাজেট বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এবার স্বাস্থ্য খাতে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মানী বাবদ ৮৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ হল দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব, দক্ষ জনবলের অভাব, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেট। এক্ষেত্রে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাজেটের যথাযথ ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। সঠিক বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।

কোভিড-১৯ জনগণের দৃষ্টি প্রসারিত করে দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য সেক্টরসহ দেশের সব উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই হয়েছে। আমাদের চিকিৎসকদের প্রত্যাশা, সময়ের দাবি, জনগণের দাবি, বিগত দিনের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। কোভিড-উত্তর বাংলাদেশ এটাই প্রত্যাশা করে।

অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ : মহাসচিব, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে